বর্ধমান–নবদ্বীপ সড়কপথে অবস্থিত পূর্ব বর্ধমান জেলার এক সমৃদ্ধশালী ও ঐতিহ্যবাহী গ্রাম ভাণ্ডারডিহি। এই গ্রামের ভট্টাচার্য পরিবার এলাকার অন্যতম প্রাচীন ও সম্ভ্রান্ত বংশ হিসেবে সুপরিচিত। সুদীর্ঘ ইতিহাস, ধর্মীয় নিষ্ঠা এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারক এই পরিবারের দুর্গাপুজো আজও বহন করে চলেছে বাংলার প্রাচীন জমিদারি সংস্কৃতি ও শারদীয় উৎসবের গৌরবময় উত্তরাধিকার।
এই বংশের আদিপুরুষ সদাশিব সার্বভৌম (ভট্টাচার্য) ভাণ্ডারডিহি গ্রামে একটি টোল বা পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষাদান শুরু করেন। পরবর্তীকালে তাঁরই এক বংশধর গৃহত্যাগ করে বিহারে গমন করেন। সেখানে ঘিয়ের ব্যবসা শুরু করে তিনি প্রচুর সম্পদ অর্জন করেন। এরপর নিজ গ্রামে ফিরে এসে বর্ধমানের মহারাজের কাছ থেকে কয়েকটি মহালের খাজনা আদায়ের দায়িত্ব বা বরাত লাভ করেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ভট্টাচার্য পরিবারের জমিদারির সূচনা ঘটে।
ADVERTISEMENT
ইংরেজি ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দ, অর্থাৎ বাংলা ১২৮২ বঙ্গাব্দ নাগাদ এই পরিবারে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। সেই থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ভাণ্ডারডিহি ভট্টাচার্য্য পরিবারের এই ঐতিহ্যবাহী শারদোৎসব। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে, এই পুজো ১৫১তম বর্ষে পদার্পণ করে এবং ঐতিহাসিক সার্ধশতবর্ষ উদ্যাপিত হয়। চলতি ২০২৬ সালে এই পুজো গৌরবের সঙ্গে ১৫২ তম বর্ষে পদার্পণ করেছে।
বর্তমানে ভট্টাচার্য পরিবারের তিনটি শরিক একত্রে এই দুর্গাপুজোর আয়োজন করে থাকেন। পরিবারের প্রত্যেক শরিকই পুজোর বিভিন্ন দায়িত্ব নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেন। একজন শরিক ষষ্ঠী ও সপ্তমীর পুজোর দায়িত্বে থাকেন, অন্যজন অষ্টমী ও সন্ধিপুজোর আয়োজন করেন এবং তৃতীয় শরিক নবমী ও দশমীর পুজোর দায়িত্ব পালন করেন।
কালিকাপুরাণ অনুসারে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়। পুজোর প্রাচীন রীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সপ্তমী, অষ্টমী ও সন্ধিপুজোয় ছাগবলি এবং নবমীতে ছাগবলি, চালকুমড়ো ও আখ বলির প্রথা। সময়ের পরিবর্তন ঘটলেও পুজোর প্রাচীন আচার, ধর্মীয় নিষ্ঠা ও পারিবারিক আবেগ আজও এই উৎসবের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ভাণ্ডারডিহি ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গাপুজোর ইতিহাসে চলতি বছর এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় সংযোজিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং পরিবারের সকল সদস্যের সম্মিলিত সহযোগিতায় এ বছর মা দুর্গার মন্দিরের নবনির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। পরিবারের সকলের সাহায্য, ভালবাসা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নবনির্মিত মন্দিরের শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এক সময় এই পরিবারের দুর্গাদালান মাটি ও খড়ের ছাউনি দিয়ে নির্মিত ছিল। পরবর্তীকালে সেখানে জোড়া টিনের ছাউনি দেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে আরও সুদৃঢ় ও স্থায়ী রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে পরিবারের সদস্যরা মন্দিরের নবনির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। অবশেষে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে।
পুরনো দুর্গাদালান
এই নবনির্মিত মন্দির শুধু একটি উপাসনাস্থল নয়; এটি পরিবারের ঐক্য, পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, ভক্তি এবং আগামী প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখার এক উজ্জ্বল প্রতীক। ১৫২ বছরের প্রাচীন দুর্গাপুজোর সঙ্গে এই মন্দিরের নব উদ্বোধন ভট্টাচার্য পরিবারের ইতিহাসে এক স্মরণীয় সংযোজন হয়ে থাকবে।
সারা বছর পরিবারের সদস্যরা কর্মসূত্রে কিংবা নানা প্রয়োজনে বিভিন্ন স্থানে বসবাস করলেও দুর্গাপুজোর সময় সকলেই ফিরে আসেন নিজেদের শিকড়ের টানে, প্রিয় গ্রাম ভাণ্ডারডিহিতে। মা দুর্গাকে কেন্দ্র করে একত্রিত হন পরিবারের ছোট-বড় সকল সদস্য। পূজার্চনা, আনন্দ, ভুরিভোজ এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে এই কয়েকটি দিন হয়ে ওঠে পরিবারের মহামিলনের উৎসব।
সময়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটেছে, বদলেছে বহু কিছু; কিন্তু মা দুর্গার প্রতি ভক্তি এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা আজও একইভাবে অটুট রয়েছে। পূর্বপুরুষদের হাতে সূচিত এই পুজো আজও পরিবারের সদস্যদের এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।
১৫২ বছরের এই ঐতিহ্য কেবল একটি পরিবারের পুজো নয়; এটি বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি, প্রাচীন জমিদারি ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং পারিবারিক বন্ধনের এক জীবন্ত নিদর্শন। আর এ বছর নবনির্মিত দুর্গামন্দিরের শুভ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সেই ঐতিহ্য লাভ করেছে এক নতুন রূপ ও নতুন গৌরব।