শুরু হয়ে গিয়েছে দেবীপক্ষ। কলকাতা নিচ্ছে তার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে টলিপাড়ার তারকারা—প্রত্যেকেই এখন ব্যস্ত তাঁদের পুজো প্ল্যানিংয়ে।এর মধ্যে রয়েছেন বর্ষীয়ান অভিনেতা অর্জুন চক্রবর্তী-ও। আজকাল ডট ইন-কে ফেলে আসা পুজোর পাশাপাশি তিনি শোনালেন এখন তিনি পুজো কীভাবে কাটান, সেই গল্প। খাস কলকাতার সঙ্গে ছোটবেলার যোগ না থাকলেও পুজোর দিনগুলোতে তাঁর যাপন বেশ অন্যরকম—
“আমার জন্ম রাজস্থানের একটি ছোট্ট গ্রামে। বাবা ডাক্তার ছিলেন। পেশার খাতিরেই রাজস্থান-ই ছিল তখন তাঁর কর্মক্ষেত্রের পরিধি। তো বলাই বাহুল্য, ছোটবেলায় রাজস্থানেই কেটেছে আমার। আমাদের সেই গ্রামে দুর্গাপুজো হত না। একটু বড় হওয়ার পর জয়পুর, উদয়পুরে প্রথমবার দুর্গাপুজো দেখলাম। সেখানকার বাঙালিরা মিলে ওই পুজোর আয়োজন করতেন। তা জয়পুরও ছিল আমাদের গ্রাম থেকে বহু-বহু দূরে। সেই বয়সে কিন্তু কোনওদিন কলকাতার পুজো দেখা হয়ে ওঠেনি আমার। কারণ স্কুলের গরমের ছুটিতে কলকাতায় আসতাম আমি। আর সেই সময়ে তো কলকাতায় পুজোর কোনও ব্যাপার-ই নেই। ফলে বুঝতেই পারছেন....
যাই হোক, গুলজার সাহেবের সহকারী পরিচালক হিসেবে বোম্বে যাওয়ার পর সেই প্রথম দেখলাম দুর্গাপুজোর জৌলুস। সেটা ১৯৮০ সাল। বাপরে বাপ! সে দারুণ ব্যাপার। তখনই প্রথম দেখলাম পুজোর চাঁদা তোলা, ভোগপ্রসাদের ব্যাপার...এইসব। সেই সময় আন্ধেরি অঞ্চলের প্রগতি ক্লাবে মেম্বারও হয়েছিলাম। পুজোয় সেখানে রবি ঠাকুরের নাটক রাজা ও রাণী মঞ্চস্থ হয়েছিল। আমি সেজেছিলাম যুবরাজ। এমন করেই পুজোতে 'ইনভল্ভ' হওয়ার সূচনা আমার। তাই আমার দুর্গাপুজোর হাল-হকিকত চেনা কিন্তু বোম্বেতে, কলকাতায় নয়। বোম্বেতেই প্রথম বিরাট দেবীমূর্তি দেখেছিলাম।
এরপর নয়ের দশকের গোড়ায় কলকাতায় চলে এলাম। তখন দুর্গাপুজো দু’চোখ ভরে দেখেছি , উপভোগ করেছি। সেই সময় কলকাতার পুজোতে অনেক সারল্য ছিল। একটা...একটা সহজ, নিপাট ব্যাপার ছিল জানেন। তখন থিমের পুজোর তো কোনও চক্কর-ই ছিল না। কলকাতা শহর ঢেকে যেত না এখনকার মতো এত বড়-বড় বিজ্ঞাপন-হোর্ডিংয়ে। অনেকটা আকাশ দেখা যেত। অনেকটা। এখন তো একেক সময় মনে হয়, পুজোটাই গৌণ হয়ে গিয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় আয়োজন এত বেশি, এত বেশি...তাই আজকাল পুজো খুব বেশি উপভোগ করতে পারি না।
পুজোতে আমি পূজাবার্ষিকীর গল্প-উপন্যাস তো পড়িই, নতুন বইও কিনি। সেসবের পাতা উল্টোই। পুরনো প্রিয় বইও ঘাঁটাঘাঁটি করে ফেলি একটু। আর জানেন তো, আমাদের যে গৃহসহায়ক রান্নার দায়িত্বে আছেন তিনি এত দুরন্ত রান্না করেন যে বাইরের খাবার আর খেতে ইচ্ছে করে না। নানান সুস্বাদু আমিষ-নিরামিষ পদ উনি রান্না করেন। সেসব চেটেপুটে খাই। পুজোর সময় বাইরে খাই না কারণ ই যে ডিমান্ড এবং সাপ্লাইয়ের ফারাকটা এত বেড়ে যায় যে কোয়ালিটিটা...তাই এই সময়টা অন্তত খাবার বিষয়ে বউকে বিশ্বাস করুন, রেস্তরাঁকে নয়। পুজোর সময় তো সেটা আমরা করি না, তাই এই অনুরোধটা রাখলাম।
আর পুজোতে আমার ছোটবেলার প্রিয় বন্ধু কাবুল কলকাতায় ফেরে। ওর আরেকটা পরিচয় আছে - চুনি গোস্বামীর ভাইপো। পুজোয় দু'টো দিন ও আর আমি আড্ডা মারি চুটিয়ে। সঙ্গে জমাটি খাওয়া-দাওয়া, পানাহার তো আছেই। প্রচুর গল্পগাছা করি।
এখানে একটা কথা বলে রাখি, আমার স্ত্রী জন্মসূত্রে অবাঙালি কিন্তু তাঁর জন্ম কলকাতায়। আমার তো মনে হয়, ও আমার থেকে অনেক মাত্রায় বেশি বাঙালি। ও কিছুতেই পুজোর সময় কলকাতা ছেড়ে যাবে না। বরং পুজোর আগে গুছিয়ে কেনাকাটা থেকে শুরু করে ঠাকুর দেখা, ঢাকিদের নিয়ে আসা, ঢাকের বাজনা শোনা ওর দারুণ পছন্দের। তাই ওর সঙ্গেও আমাকে প্যান্ডেল হপিং-এ বেরোতে হয় বইকি। ও কিন্তু আবার ভিড়টা আবার পছন্দ করি। যে যেহেতু ভিড়টা আমি একেবারেই নিতে পারি না, তাই করি কী ভোরবেলা গাড়িটা নিয়ে টুক করে বেরিয়ে যাই। তখন পুজোর কলকাতা ঘুমোতে গিয়েছে সবে, চারপাশ বেশ ফাঁকা-ফাঁকা। ওই সময় ঝটপট প্রতিমা দর্শনটা সেরে ফেলি ও আর আমি। এরপর পুজোর সিনেমা তো মাস্ট। প্রতি বছরই দেখি। এ বছরও দেখব।
পুজো ভাল কাটুক সবার, আমরা যেন আরও একটু সহনশীল হই, চোখটা কম পাকায় একে-অন্যকে, এই প্রার্থনাই করি।