সুমনা চক্রবর্তী: বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো শুধুমাত্র একটি উৎসব নয়। দুর্গাপুজো মানে একগুচ্ছ স্মৃতি, নস্টালজিয়া। যা আমাদের মনকে পুরোনো দিনগুলিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। শ্রাবণের চাদর সরতে সরতে আশ্বিন প্রায় আগত। পাহাড়ি রাস্তার ধারে সারি সারি কাশফুল ফুটতে শুরু করেছে। বিকেলের আকাশ বেয়ে সূর্যাস্তের রং লাল, নীল, সোনালী ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের গায়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে কতশত আবেগ। ম্যাপলের পাতায় দেখা যাচ্ছে কমলা ও লালের ছোঁয়া। বাতাসের স্নিগ্ধ আমেজ আর স্তরে স্তরে সাজানো শুভ্র মেঘের অপার্থিব সৌন্দর্য মনের কোণে পুজোর গন্ধ ছড়ায়। প্রবাসের পুজোয় এটুকুই পাওয়া। সকালে শিউলি ফুলের মোহিত করা গন্ধ নেই। শিউলি পাতার সবুজ ডগায় রাতের পড়ে থাকা শিশিরের টুপটাপ শব্দ নেই। টলটলে ঝিলের জলে তীর তীর করা বাতাসের দোলায় গোলাপী পদ্মের ঢেউ নেই, তাতে কী? মা তো সবার। বাঙালি যেখানেই ওনার আরাধনা করেন, সেখানে তো আসতেই হবে। ইউটিউবে পুজোর সপ্তাহ দুয়েক আগে থেকেই বাজতে শুরু করে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ। প্রবাসী বাঙালি শুরু করে দেয় মাতৃবন্দনার প্রস্তুতি।
আমাদের সান দিয়েগোর বাঙালি কমিউনিটি পুজোর নাম 'সৈকত'। সমুদ্রের ধারের শহর বলে 'সৈকত' নামটি বেছে নেওয়া হয়। এবারে পুজো হবে অক্টোবরের ১৭ ও ১৮ তারিখে। ১৯৫৪ কমেট ওয়ে, সান দিয়াগো, ক্যালিফোর্নিয়ার একটি হাইস্কুলে। আঁকাবাঁকা পথ চলতে চলতে পুজোর বয়স হল একুশ বছর। শুরু হয়েছিল সান দিয়েগোর একটি বাঙালি পরিবারের হাত ধরে। একটিই দিন পুজো হত। কমলেন্দু ও প্রতিমা পুজো করতেন। সেই একটি মাত্র দিনের পুজো উপভোগ করতাম আমরা। দেশ থেকে আনা সুটকেসে ন্যাপথালিন মাখানো শাড়িগুলো বার বার করে ছোঁয়া, মাঝে মাঝে গায়ের মধ্যে জড়িয়ে ঐ নতুন শাড়ীর গন্ধে মন ভেজানো চলতেই থাকতো পুজো আসা পর্যন্ত। শাড়ী পড়তে পারতাম একটি দিন, কিন্তু গুনতাম চারদিনের। শুধু কী তাই, কোনটা যে পড়ব তা বুঝে উঠতে পারতাম না।
আস্তে আস্তে বাঙালিদের সংখ্যা বাড়তে থাকল। প্রয়োজন পড়ল বড় করে পুজো করার। ২০০৬ সালে কুমারটুলি থেকে এল ঠাকুর, শুরু হল 'সৈকত'-এর পুজো। হইহই করে বাঙালিদের সঙ্গে অবাঙালিরাও যুক্ত হলেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মঙ্গলকামনায় এবারে আমাদের পুজো একুশ বছরে পদার্পণ করল। গত বছরের পুজোর আয়োজন করেছিল এখানকার সব বাঙালি মিলেই। ঠাকুর আনা থেকে মালা গাঁথা, অঞ্জলি থেকে ভোগ সবের আয়োজন ছিল। জোগাড় করা হয়েছিল বেল, তুলসী, দুর্বা ও পদ্মফুলও। আগুন জ্বালানো একেবারেই নিষিদ্ধ বলে ব্যবহার করা হয় LED মোমবাতি।
চারদিনের পুজো দু'দিনে সমাপ্ত হলেও ঘাটতি পড়ে না কোনকিছুরই। সকালে নিরামিষ ও রাতে আমিষ খাওয়ার আয়োজন থাকে। মাছের কালিয়া থেকে বিরিয়ানি, কোপ্তা থেকে সন্দেশ। সান্ধ্যকালীন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয় জমজমাট। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে অনুষ্ঠান করতে আসে বাইরে থেকেও। এর আগেরবার এসেছিলেন নন্দী সিস্টার্স ও গৌরব চ্যাটার্জীর লক্ষ্মীছাড়া ব্যান্ড। এখন পুজোয় বারোশোর বেশি লোকসমাগম হয়। পুজো দেখতে আসে অরেঞ্জ কাউন্টি, লস এঞ্জেলেস থেকেও।
এবারেও শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে পুজোর প্রস্তুতি। 'সৈকত' কমিটির থেকে ইমেল চলে এসেছে অনুষ্ঠানের। পুজোর সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় শিল্পীরা মিলে করবেন নটী বিনোদিনী যাত্রাপালা। এছাড়া নাচ, গান, ছোটদের নাটক পরিবেশিত হবে। দুর্গতিনাশনীর আরাধনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাহিত্য আরাধনা। তাই 'সৈকত' থেকে প্রতিবারের মত এবারেরও প্রকাশিত হবে 'সৈকত' পত্রিকা। দশমীর বিকেল সাজবে হলুদ পাঞ্জাবীর ঢাকের বাজনায়। দশমীর সন্ধ্যা মাতাতে মুম্বাই থেকে আসছেন শিবম পাঠক। উনি একসময় ইন্ডিয়ান আইডল সিজন ফাইভ এর প্রথম পাঁচজনের মধ্যে ছিলেন।
আগেকার দিনে বাঙালি গেরস্ত বাড়িতে একখানা পঞ্জিকা থাকত, যা দেখে যে কোনও শুভ অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ স্থির করা হত। আজ স্মার্টফোনের যুগে প্রবাসী বাঙালি অনলাইন বাংলা ক্যালেন্ডারে সার্চ করে পুজোর দিনক্ষণ স্থির করে ফেলেছে। মা সন্তানসন্ততি নিয়ে সুটকেস গোছাতে শুরু করেছেন সান দিয়েগোর 'সৈকত' এর পুজোয় আসবেন বলে। আমরাও উঠোন সাজাতে শুরু করেছি ওনার আসার অপেক্ষায়।