Loading...

'যেখানে পড়েছিল মায়ের করোটি', আজও সেখানে জেগে আছে কিরীটেশ্বরী, কালীপুজোর আগেই জানুন অজানা কাহিনি

আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের শ্রেষ্ঠ পর্যটন গ্রামের তকমা পাওয়া গ্রাম, তার মধ্যেই লুকিয়ে আরও এক কাহিনি। মুর্শিদাবাদের কিরীটেশ্বরী। শান্ত, সবুজ, ইতিহাসে মোড়া এই গ্রামের পরিচয় শুধু তার সৌন্দর্যে নয়, তার পরিচয় আরও এক কারণে। কারণ এই গ্রামেই রয়েছে ৫১ সতীপীঠের অন্যতম পীঠ, কিরীটেশ্বরীর মন্দির।

ADVERTISEMENT

হিন্দু পুরাণ অনুসারে, শিব যখন সতীর দেহ নিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিক্রমা করছিল, তখন বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে সতীর দেহ ৫১টি টুকরো হয়ে ভারত-সহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় পড়ে। যেখানে যেখানে সেই দেহাংশ পড়েছিল, সেখানেই পরবর্তীকালে সতীপীঠ গড়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

পুরাণ মতে, মুর্শিদাবাদের কিরীটেশ্বরী গ্রামে সতীর ললাটের ঊর্ধ্বভাগ বা করোটি পড়েছিল। সেখান থেকেই এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় একান্ন সতীপীঠের অন্যতম পীঠ কিরীটেশ্বরী মন্দির। করোটি থেকে গ্রামের নাম হয়েছে কিরীটেশ্বরী।

তবে এই গ্রামে রয়েছে তিনটি মন্দির এবং প্রতিটি মন্দিরই আসল কিরীটেশ্বরী মন্দি্রের দাবি করে। এই দাবি-পাল্টা দাবি নিয়েই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বেঁচে আছে গ্রামের মাহাত্ম্য।

কিরীটেশ্বরী বড় মন্দিরের সেবাইত দিলীপ ভট্টাচার্য বলেন, 'আমাদের মন্দিরটি যেখানে অবস্থিত, সেখানেই সতী মায়ের ঊর্ধ্ব ললাটের অংশ বা করোটি পড়েছিল। তাই সেখান থেকেই গ্রামের নাম হয়েছে কিরীটেশ্বরী। মূল মন্দির ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর রানি ভবানী এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে ১৩১৩ বঙ্গাব্দে রাও যোগেন্দ্রনারায়ণ রায় এই মন্দিরটি সংস্কার করে দেন।'

তিনি আরও জানান, 'এখানে মায়ের মূর্তি নেই, আছে শুধু একটি শিলা খন্ড । সেই শিলাকে সাজিয়ে ফুল বেলপাতা সহযোগে মায়ের করোটি রূপে পুজো করা হয়।'

এছাড়াও ওই গ্রামে রয়েছে কিরীটেশ্বরী গুপ্ত মন্দির। এই মন্দিরের সেবাইত নয়ন ব্যানার্জি জানান , তাঁদের মন্দিরেই রয়েছে দেবীর করোটি। মন্দিরের ইতিহাস বলতে গিয়ে তিনি বলেন , 'কিরীটেশ্বরীর আদি মন্দিরে একসময় মায়ের করোটি ছিল। মুঘল আমলে যখন একের পর এক হিন্দু মন্দির ধ্বংস করা হচ্ছিল, সেই সময় রাস্তার ধারের সামনের মন্দির থেকে গোপনে গুপ্ত মন্দিরে মাকে নিয়ে চলে আসা হয়। এখানে মায়ের করোটি বরাবরই ঢাকা অবস্থায় রয়েছে।'

জনশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় এই গ্রামে ১৫২ ঘর পান্ডা থাকতেন। তাঁদের মধ্যে কিছু পান্ডা কৌতূহলী হয়ে মূর্তির এই ঢাকা রূপটি খুলে দেখতে যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁরা সকলেই নাকি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং গ্রামের বাকি পান্ডারা কয়েক মাসের মধ্যে ধীরে ধীরে মৃত্যুবরণ করেন। এই ঘটনার পর থেকে আর কেউ ওই ঢাকা খোলার সাহস করেননি।

তবে এই আসল-নকলের তর্ক-বিতর্ককে সরিয়ে রেখে এখনও বছরের প্রতি অমাবস্যা তিথিতে নিশিরাতে পুজো হয় কিরীটেশ্বরী মূল বড় মন্দিরে। আর কৌশিকী ও দীপান্বিতা অমাবস্যায় জাঁকজমক সহকারে পুজো হয় সেখানে । বড় মন্দিরের সেবাইত দিলীপ ভট্টাচার্য আরও জানান, 'বছরের প্রত্যেক অমাবস্যাতেই আমাদের এই নিশিরাতে পুজো প্রচলিত। কিন্তু কৌশিকী এবং দীপান্বিতা অমাবস্যায় এখানে অনেক বেশি পরিমাণে লোকসমাগম হয়। এই দু'টি অমাবস্যায় আমাদের এখানে রাত বারোটার পর পুজোয় বসা হয়। পুজোর পর হয় বলিদান প্রথা, তারপর ভোগ দান এবং তারপর যজ্ঞ। সবশেষে আরতি করে মন্দির বন্ধ করা হয় ।সব শেষ হতে ভোর চারটে সাড়ে চারটে বেজে যায়।'

কালীপুজোর রাতে গোটা গ্রাম আলোয় সেজে ওঠে। দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত আসেন মায়ের দর্শনে। আবার কেউ আসেন মনস্কামনা পূরণের আশায়। তবে কিরীটেশ্বরী শুধু একটি তীর্থক্ষেত্র নয়, এটি এখন ভারতের পর্যটন মানচিত্রে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। ভারতের 'শ্রেষ্ঠ পর্যটন গ্রাম-এর স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে এখানে পর্যটকদের আনাগোনা আরও বেড়েছে।

ভাগীরথীর তীরে, ইতিহাস আর ভক্তির মেলবন্ধনে দাঁড়িয়ে থাকা এই গ্রাম আজও প্রমাণ করে, বিশ্বাস কখনও পুরনো হয় না।

ADVERTISEMENT