আজকাল ওয়েবডেস্ক: আদি গঙ্গার পাড়ে ঘন জঙ্গল, পাশেই মহাশ্মশান। অমাবস্যার নিকষ কালো রাতে সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করে ভেসে আসে মন্ত্রোচ্চারণ! লোকবিশ্বাস, গভীর রাতে এই মন্দিরে জাগানো হয় ডাকিনী-যোগিনীদের। মদ-মাংসের নিবেদন, শিয়ালের ভোগ আর রুদ্ধদ্বারের ভিতরে তন্ত্রসাধনা- সব মিলিয়ে রহস্যে মোড়া দক্ষিণ ২৪ পরগনার মন্দিরবাজার থানার দক্ষিণ বিষ্ণুপুরের মহাশ্মশানের কালীপুজো।
শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া এই কালীমন্দিরকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা, বিশ্বাস এবং সাধনার দীর্ঘ ইতিহাস। শ্মশানের ধারেই অবস্থিত মায়ের মন্দির। একদিকে উগ্র চণ্ডীর রূপ, হাতে খড়্গ, অন্যদিকে মাতৃমূর্তিতে স্নেহময়ী মায়ের পরশ। ভক্তদের বিশ্বাস, এই মা অত্যন্ত জাগ্রত। জীবনের নানা সমস্যা, চাকরি, সন্তান কিংবা মনোস্কামনা পূরণের আশায় বহু দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন মায়ের দরবারে। মন্দিরে মানত করে ঢিল বেঁধে যান অনেকে।
কথিত আছে, একসময় এই মহাশ্মশানে সাধনা করতে আসতেন বহু সন্ন্যাসী ও তান্ত্রিক। তান্ত্রিক মণিলাল চক্রবর্তী এই পুজোর প্রচলন করেছিলেন বলে জানা যায়। লোকমুখে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, তন্ত্রমতে ১০৮টি নরমুণ্ড নিয়ে শুরু হয়েছিল মায়ের আরাধনা। শ্মশানের খুলি দিয়ে মায়ের চালচিত্র সাজানোর কথাও শোনা যায়। এমনকী অপঘাতে মৃতদের আত্মার বিচরণ নিয়েও রয়েছে নানা জনশ্রুতি। যদিও এসব কাহিনির স্বাধীন প্রমাণ মেলে না।
বর্তমানে পুজোর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মণিলাল চক্রবর্তীর ছেলে, সত্তরোর্ধ্ব শ্যামলাল চক্রবর্তী। বাবার কাছ থেকেই তন্ত্রসাধনা ও গুপ্তবিদ্যার শিক্ষা পেয়েছেন তিনি। শ্যামলালবাবুর কথায়, “বাবার থেকে তন্ত্রসাধনা, গুপ্তবিদ্যা শিখে মায়ের পুজো করি। পঞ্চমুণ্ডির আসন তৈরি হয় তান্ত্রিক মতে। এখন শবসাধনা আর হয় না, তবে তান্ত্রিক বিধি মেনেই মায়ের পুজো হয়।”
তাঁর দাবি, স্বপ্নাদেশের পর শুধু অমাবস্যায় নয়, নিত্যপুজোর ব্যবস্থাও শুরু হয়। একসময়ের বাঁশের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট মন্দির এখন পাকা হয়েছে। তন্ত্রমতে পুজো হলেও প্রথম থেকেই এখানে বলিপ্রথা নিষিদ্ধ বলে জানিয়েছেন মন্দিরের সেবায়েত।
কালীপুজোর রাতে মদ, কাঁচা মাংস ও ছোলা নিবেদন করে ডাকিনী-যোগিনীর আরাধনার রীতি রয়েছে বলে জানান শ্যামলালবাবু। মাংসের ভোগ শিয়ালকে দেওয়ার পরম্পরাও নাকি চলে আসছে মণিলাল চক্রবর্তীর সময় থেকে। তাঁর বক্তব্য, “তন্ত্রমতে মায়ের পুজো হয় বলে অন্য পুরোহিত এখানে পুজো করতে পারবেন না। আমিই মায়ের পুজোর দায়িত্ব নিয়েছি।”
পুজোর নির্দিষ্ট সময়েই সাধারণ ভক্তদের প্রবেশের অনুমতি মেলে। উপাসনার মূল পর্ব হয় রুদ্ধদ্বারের ভিতরে। সেই সময় মন্দিরের ভিতরে কী হয়, তা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ থাকে না সাধারণ মানুষের।
অমাবস্যার রাতে যখন শ্মশানের পরিবেশ আরও গাঢ় হয়, তখন এই মন্দির ঘিরে ভক্তদের বিশ্বাস, লোককথা আর রহস্যের আবহ যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে। তন্ত্রসাধনার ঐতিহ্য আর মাতৃআরাধনার টানে আজও দক্ষিণ বিষ্ণুপুরের মহাশ্মশানে ভিড় জমান অসংখ্য মানুষ।