আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গল আর আলোর রোশনাইয়ের ভিড়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সোঁদা মাটির গন্ধ, গরুর গাড়ির ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ, কুমোরের চাকা ঘোরা মাটির সুবাস। সেই হারিয়ে যাওয়া গ্রাম বাংলাকেই এবার শহরের বুকে ফিরিয়ে আনল বহরমপুরের কান্তনগর লিচুবাগান বিবেকানন্দ সেবা সংঘ। ৩০ বছরে পা দিয়ে এবার তাদের দুর্গাপুজোর থিম- 'কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি'।
পুজো মণ্ডপে পা রাখলেই মনে হবে, শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে কোনও এক অজ পাড়াগাঁয়ে চলে এসেছেন আপনি। কোথাও মাটির রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে গরুর গাড়ি, তার উপর বোঝাই করা মাটির হাঁড়ি-কলসি। কোথাও বসে তাঁতি আপন মনে তাঁত বুনছেন। কোথাও আবার কুমোর ব্যস্ত মাটির তালকে আকার দিতে। একটু এগোলেই দেখা মিলবে মাথায় ঝুড়ি নিয়ে হেঁকে চলা সবজিওয়ালার। গ্রামের মাটির ঘর, উঠোন, খড়ের চাল, গোয়াল ঘর - সব মিলিয়ে এক জীবন্ত গ্রামের ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পীরা।
এ বছর বিবেকানন্দ সেবা সংঘের পুজো ৩০ বছরে পদার্পণ করেছে। আর এই বিশেষ বছরকে স্মরণীয় করে রাখতেই উদ্যোক্তারা বেছে নিয়েছেন গ্রাম বাংলার এই শিকড়ের থিমকে। আধুনিকতার চাকচিক্য নয়, বরং আড়ম্বরহীন, সাদাসিধে গ্রাম্য জীবনকেই তারা তুলে ধরতে চেয়েছেন।
মণ্ডপের প্রতিটি কোণায় রয়েছে নিখুঁত গ্রাম্য ছোঁয়া। প্রবেশ পথেই দর্শনার্থীদের স্বাগত জানাচ্ছে একটি পূর্ণ আকারের গরুর গাড়ি। মণ্ডপের দেওয়াল জুড়ে মাটির প্রলেপ, তৈরি করা হয়েছে গ্রামের বাড়ি।
শুধু মণ্ডপসজ্জাই নয়, প্রতিমাতেও রয়েছে সেই গ্রাম বাংলার ছাপ। এখানে দেবী দুর্গা যেন গ্রামেরই এক মা, সন্তানদের নিয়ে সংসার আগলে রেখেছেন। জাঁকজমকপূর্ণ সাজ নয়, বরং সাবেকি, ঘরোয়া রূপে দেবীর আরাধনা হচ্ছে এখানে। আর রয়েছে, গ্রামেরই বিভিন্ন পেশার মানুষ। কুমোর, কামার, চাষী, জেলে - তাঁরাও যেন মায়ের আগমনে সামিল হয়েছেন। এই ভাবনাই মন কেড়েছে দর্শকদের।
পুজো কমিটির এক সদস্য রামপ্রসাদ মন্ডল বলেন, "আমরা চেয়েছি আজকের প্রজন্মকে দেখাতে, আমাদের গ্রাম কেমন ছিল। এখনকার ছেলেমেয়েরা গরুর গাড়ি চড়েনি, কুমোরের চাকা ঘুরতে দেখেনি। তাদের কাছে এই দৃশ্য নতুন। আবার বয়স্কদের কাছে এটি নস্টালজিয়া। পঞ্চমী থেকেই যে ভাবে দর্শনার্থীরা ভিড় জমাচ্ছেন এবং প্রশংসা করছেন, তাতে আমরা আপ্লুত। সবাই বলছেন, মণ্ডপে ঢুকে মনে হচ্ছে সত্যিই কোনও গ্রামে চলে এসেছি। এটাই আমাদের সার্থকতা।"
দর্শনার্থীদের প্রতিক্রিয়াও একই সুরে বাঁধা। বহরমপুরের বাসিন্দা অনুষ্কা সরকার বলেন, "বহরমপুরের অনেক প্যান্ডেলই ঘোরা হয়েছে। কিন্তু এই প্যান্ডেলটা সবচেয়ে আলাদা। এখানে ঢুকতেই মনে হচ্ছে শহর থেকে অনেক দূরে কোনও গ্রামে চলে এসেছি। প্রতিটি জিনিস এত জীবন্ত, এত নিখুঁত যে চোখ ফেরানো যাচ্ছে না। আমার দেখা এবারের সেরা মণ্ডপ এটি।"