আর ক’টা দিন পরেই মহালয়া। তারপরেই শুরু হয়েযাবে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। এহেন উৎসবের আমেজে বুঁদ হয়ে অতীতের পাতা উল্টোলেন জনপ্রিয় অভিনেতা-গায়ক অরিন্দম গাঙ্গুলি। আসলে, তাঁর জীবনটাই আবর্তিত হয়েছে অভিনয়, মঞ্চ এবং গান-কে কেন্দ্র করে। তাই তাঁর ছোটবেলা, কৈশোর এবং প্রিয় পুজোর স্মৃতিতেও যে জুড়ে থাকবে সহজিয়া মনকেমনের সুর এতে আর আশ্চর্যের কী!
“আমার বড় হয়ে ওঠা কিন্তু খাস উত্তর কলকাতায়। জগৎ মুখার্জি পার্কের যে পুজোটা এখন খুব বিখ্যাত, ওইটি ছিল আমার পাড়া। আমার ছোটবেলায় মানে ছয়ের দশকের কলকাতায় কিন্তু এত ভিড় হতো না পুজোয়। থিমের প্যান্ডেলের তো প্রশ্নই নেই। তবে ওই সময়েই আমার পাড়ার পুজোতে তৈরি হত 'আর্টের ঠাকুর'। মানে একচালার নয়, বেশ অন্যরকম প্রতিমা। এখনও মনে গেঁথে রয়েছে সেই প্রতিমার মুখ। ওখানে একটি জমিদারবাড়ির চাতালে প্রতিমা তৈরির কাজ চলত, আমরা ছোটরা দল বেঁধে গিয়ে দেখতাম। বাইরে মাঠে প্যান্ডেলের বাঁশ পড়ছে, মঞ্চ বাঁধা হচ্ছে আমরা হুটোপুটি করতাম। আর মজার কথা ওই পুজোর দৌলতেই কিন্তু আমরা শিল্পীজীবনের হাতেখড়ি। আসলে, খুব উৎসাহ ছিল মাইকে কথা বলার। ওই একটু অ্যানাউন্সমেন্ট করার সুযোগ পাওয়ার আশায়। তা টুকটাক পেতামও ‘পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হবে..ঠিক করে লাইনে দাঁড়ান, একদম হুড়োহুড়ি করবেন না, সবাই সুযোগ পাবেন’-এই ধরনের কথাবার্তা আর কী।
তা জমিয়ে বলতামও, খুবই উৎসাহ নিয়ে। আর একটু ফাঁক পেলেই দু-তিন কলি গানও গেয়ে দিতাম! আর ওই পার্কের সামনে একজন আলুকাবলিওয়ালা বসতেন। আহা! কী তার স্বাদ। এখনও মুখে লেগে। খুব লোভ ছিল কারণ আমাকে বাড়িতে ওসব খেতে দেওয়া হত না। তাই তক্কে তক্কে থাকতাম। যেই দেখতাম বন্ধুরা কিনে খাচ্ছে, সোজা গিয়ে হাত পাততাম। আজও কিন্তু পুজোয় বাইরের জিনিস খেতে খুব ভালবাসি। সবই খেয়ে চেটেপুটে কিন্তু খুব অল্প পরিমাণে। আমার স্ত্রী কিন্তু একটুও বকা দেয়না। ও জানে রাস্তার ঘুগনি, ঝালমুড়ি খাওয়ার জন্য কতটা ছটফট করি আমি।
যাই হোক, এরপর ‘হংসরাজ’ হল। সেই বছরের পুজো...বাপরে বাপ্! পাড়ার পুজোতে বেরোলেও মানুষ ভেঙে পড়ত ‘হংসরাজ’কে দেখতে। কী ভিড়, কী ভিড়। আর সেই বছর পুজোতে বাড়ি থেকে বেরোতে দেয়নি আমাকে। পরের বছরের পুজোতেও একই ব্যাপার ছিল। তবে আমার কিন্তু ভয় লাগত না ভিড় দেখে, বরং বেশ মজাই পেতাম। তারপর পুজোতে মঞ্চে গানের অনুষ্ঠানেও করেছি। সেটাও এক দারুণ অভিজ্ঞতা।
এরপর দক্ষিণ কলকাতায় চলে এলাম। লেক টেম্পল রোডে থাকতাম। বয়স বাড়ল। অভিনয়-গান আরও আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেল জীবনের সঙ্গে। সার্দান অ্যাভিনিউ অঞ্চলে শিবমন্দির ক্লাবের পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম। দীর্ঘ বছর পুজোর সময় ওই ক্লাবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলাম আমি। বহু বহু বড়-বড় শিল্পীরা পারফর্ম করে গিয়েছেন। একদম পরিচ্ছন্ন বাংলা গান। আর জানেন তো, এই যে থিমের পুজোর দৌলতে যে প্রতিযোগিতামূলক বিষয়টি এসেছে পুজোর সময়, এটা কিন্তু আমার বেশ লাগে। কেন ভাল লাগে? কারণ এই আবহাওয়ার দৌলতেই কত দারুণ-দারুণ সব ভাবনা রূপ পায়। আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখি শিল্পের কত রূপ, কত বার্তা, কত আঙ্গিক...
শেষ করি একটু আড্ডা আর মজা দিয়ে। শতাব্দী রায় আমাদের পরিবারের খুব ঘনিষ্ঠ। বহু বছর ধরেই। নয়ের দশকে যখন অভিনেত্রী হিসেবে ওর কেরিয়ার তুঙ্গে আমার পরিবারের সঙ্গে ও পুজোয় ঠাকুর দেখতে বেরোত। একটু রাত করেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম আমরা। দিব্যি হেঁটে হেঁটে ঢুকতাম প্যান্ডেলে, কোনও অসুবিধে হতো না। একবার কী হয়েছে, শতাব্দীর জন্মদিন পড়েছে পুরো পুজোর মধ্যে। কলকাতার একটি বড় রেস্তরাঁয় গিয়েছি ডিনার করতে। এবার যেই না ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা ছুঁয়েছে, অমনি আমরা সমবেতভাবে চিৎকার করে 'হ্যাপি বার্থডে' বলে উঠেছি...সঙ্গে হাসাহাসি একটু হৈ-হাল্লা। ব্যাস! রেস্তরাঁর কর্ণধার আমাদের বের করে দিল....বুঝুন!” বলতে বলতে জোর গলায় হেসে উঠলেন শিল্পী।
“এখন বালিগঞ্জ কালচারালের পুজোর মণ্ডপে পুজোর আড্ডাটা জমিয়ে দিই। হাত-পা ছড়িয়ে মণ্ডপে বসে, নরম রোদ গায়ে মেখে ওই যে আড্ডাটা...আহা! কোনও তুলনা হবে না। তাই পুজো সব মিলিয়ে আমার কাছে বড় সহজ, বড় আনন্দের। কিছু না করলেও এমনিই ভাল লাগে। আর জানেন, আজও পুজো যখন শেষ হয়ে যায়, খুব কষ্ট হয়। আশ্চর্যজনকভাবে কেন জানি সেই সময়ে আমার ছোটবেলাটাকে খুব মনে পড়ে...”