Loading...

প্রবাসের মাটিতে এক টুকরো বাংলা, হাইডেলবার্গে ‘দোসর’-এর দুর্গোৎসব ঘিরে বাঙালির মিলনমেলা

আজকাল ওয়েবডেস্ক: শরতের হিমেল হাওয়া যখন জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমে নেকার নদীর জল ছুঁয়ে যায়, ঐতিহাসিক হাইডেলবার্গ শহরের প্রাচীন দুর্গ আর ওল্ড ব্রিজের পাথুরে চত্বরে তখন ঝরে পড়ে সোনালি ওক-ম্যাপেলের পাতা। রোমান্টিক স্থাপত্য আর বহু শতাব্দীর প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খ্যাত এই শহরে জ্ঞানচর্চা ও জীবিকার সুবাদে দীর্ঘদিন ধরেই গড়ে উঠেছে প্রবাসী বাঙালিদের এক প্রাণবন্ত সমাজ। তবে কাশবোনের দোলা কিংবা শিউলির গন্ধ না থাকলেও প্রতি বছর শরৎ এলেই বুকের ভেতর বেজে উঠত এক নীরব শূন্যতার সুর। উৎসবের দিনগুলোতে দুর্গাপূজার আনন্দের খোঁজে হাইডেলবার্গের মানুষদের ছুটে যেতে হতো বহু দূরের স্টুটগার্ট কিংবা ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে। নিজস্ব আঙিনায় উৎসবের সেই তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই ২০২৪ সালে হাইডেলবার্গের কয়েকজন সমমনস্ক বাঙালির অন্তরে রূপ নেয় এক স্বপ্ন - সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘দোসর’। শুরু হয় তাদের নিজস্ব দুর্গাপুজো।

২০২৪-এর সেই সূচনাটি ছিল বড়ই আন্তরিক, নিতান্তই ঘরোয়া। সাকুল্যে কয়েকটি পরিবার। কিন্তু তাঁদের চোখের স্বপ্ন আর হৃদয়ের তাগিদ ছিল অসীম। স্টুটগার্ট থেকে প্রতিমা এনে বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মেনে সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত বাঁধা হয়েছিল পুজোর দিনলিপি। প্রবাসের ব্যস্ততার মধ্যেও কোনও আপস ছিল না শাস্ত্রীয় বিধানে। নিয়মনিষ্ঠ আরাধনা, সরাসরি চণ্ডীপাঠের পুণ্যধ্বনি, ঘরোয়া গান-নাচের আসর আর দু’বেলার ধোঁয়া-ওঠা খাঁটি বাঙালি খাবার। ভিনদেশের মাটিতে সেই প্রথম কয়েকটি বাঙালি পরিবার তৈরি করল নিজস্ব এক চেনা ঠিকানা, যেখানে অঞ্জলির পুষ্পস্তবকের সঙ্গে মিশে গেল একাত্মতার আনন্দ।

ADVERTISEMENT

এক বছরে আরও বড়, আরও বর্ণময়

আরও পড়ুন

পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে ‘দোসর’-এর সেই ঘরোয়া আয়োজন ডালপালা মেলে হয়ে উঠল আরও বর্ণময় ও সুসংগঠিত। সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত পুজোর চিরাচরিত আচারের পাশাপাশি প্রতিদিনের সন্ধ্যা মুখরিত হল উচ্চমানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। কলকাতা থেকে উড়ে এল জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ড ‘ক্রসউইন্ডস’, তাদের সুরের মূর্ছনা আর মার্গসংগীতের গম্ভীর আলাপ প্রবাসের বুকে বইয়ে দিল চেনা কলকাতার হাওয়া। অষ্টমীর সন্ধ্যায় রঙিন পোশাকের ঘূর্ণিতে যোগ হল ঐতিহ্যবাহী গরবা ও ডান্ডিয়া, আর মণ্ডপ চত্বরে সাজল মনমাতানো স্ট্রিট ফুড ফেস্টিভ্যাল। গান, গল্প, খাবার আর নিখাদ আড্ডায় নেকারের পাড় যেন হয়ে উঠল এক টুকরো বাংলা।

এবার পাঁচ দিনের উৎসব, প্রস্তুতি তুঙ্গে

সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার ‘দোসর’ সাজছে আরও বড় ক্যানভাসে পাঁচ দিনব্যাপী শারদোৎসবে। পঞ্জিকা আর শাস্ত্রীয় নিয়মকানুন মেনেই প্রস্তুত হচ্ছে পুজোর নির্ঘণ্ট। থাকবে বরাবরের মতো সরাসরি চণ্ডীপাঠের ব্যবস্থা। সপ্তাহান্তের অবসরে এখন ক্লাব সদস্যদের উৎসবের প্রস্তুতি তুঙ্গে। নাচের মুদ্রার নিখুঁত অনুশীলন আর গানের সুরের মহড়ায় প্রবাসের সন্ধ্যাগুলো এখন অন্য এক ছন্দে বাঁধা।

মণ্ডপসজ্জাতেও এবার রাখা হচ্ছে বাংলার মাটির নিবিড় ছোঁয়া। থার্মোকলের সূক্ষ্ম নকশার পাশাপাশি মণ্ডপজুড়ে প্রাধান্য পাচ্ছে বাংলার চিরন্তন মাদুরের শিল্পকর্ম। কলকাতা থেকেই সদস্যদের হাত ধরে হাইডেলবার্গে এসে পৌঁছেছে সাজসজ্জার নানা উপচার। শুধু মণ্ডপ নয়, পুজো প্রাঙ্গণকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলতে বিভিন্ন নান্দনিক হস্তশিল্পের পসরা সাজিয়ে বসবেন সদস্যরা।

রান্নাঘরে তৈরি হবে নানা ধরনের বাঙালি খাবার

বাঙালির দুর্গাপুজো মানেই যে রসনারও মহোৎসব! উৎসবের দিনগুলোতে তাই কোনও বাইরের বাণিজ্যিক ক্যাটারিং নয়, ‘দোসর’-এর সদস্যরা নিজেদের রান্নাঘরের দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন কাঁধে। সেখানেই প্রতিদিন পরম যত্নে তৈরি হবে দ্বিপ্রাহরিক ও নৈশ আহার- ঘরোয়া বাঙালি পদের চেনা গন্ধ আর ভালোবাসার পরশ নিয়ে। প্রবাসের দূরত্ব ভুলে এক পঙ্ক্তিতে বসে সেই প্রসাদ গ্রহণের মুহূর্তগুলোই আসলে আত্মীয়তার বন্ধন পোক্ত করে তোলে।

গান, নাটক, ধুনুচি নাচ- উৎসবের মঞ্চে নানা আয়োজন

উৎসবের ক’দিন মঞ্চ মাতাতে প্রস্তুত দেশ-বিদেশের নানা শিল্পী। ধুনুচি নাচের উচ্ছ্বাস আর কাঁসর-ঘণ্টার তালের পাশাপাশি থাকছে ব্যান্ডের সুরের ঝংকার। নবমীর সন্ধ্যায় বিশেষ মাত্রা যোগ করতে স্টুটগার্ট থেকে আসছে একটি নাট্যদল। উৎসবের মাঝে থাকছে গরবা-ডান্ডিয়া ও জিভে জল আনা স্ট্রিট ফুড। আর দশমীর বিদায়লগ্নে, যখন প্রতিমা নিরঞ্জনের সুর মনকে ছুঁয়ে যায়, তখন বিজয়ার আসরে সুরের মায়াজাল বুনবেন লন্ডন প্রবাসী এক সংগীতশিল্পী।

ছোটদের জন্যও থাকছে আলাদা আয়োজন

প্রবাসে উৎসবের আসল সার্থকতা নতুন প্রজন্মের চোখে আলো জ্বালানোয়। জার্মানিতে স্কুলের সাধারণ নিয়মের মাঝেও সপ্তাহান্তের দিনগুলোতে আর প্রতি সন্ধ্যার আলোয় মণ্ডপ মুখরিত করে রাখবে শিশুরা। বড়দের আয়োজনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তারাও শামিল হবে আনন্দে। খুদে সদস্যদের কথা মাথায় রেখে তাদের পছন্দসই খাবারেরও থাকছে বিশেষ আয়োজন। বড়দের নিষ্ঠার সঙ্গে ছোটদের এই প্রাণবন্ত উপস্থিতিই উৎসবকে সার্বিক পূর্ণতা দেয়।

কয়েকটি পরিবার থেকে এক বড় ঠিকানা

মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে ‘দোসর’ আজ আর স্রেফ কয়েকটি পরিবারের পুজো নয়, এটি হয়ে উঠেছে জার্মানির নানা প্রান্ত এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে ছুটে আসা প্রবাসী বাঙালিদের বার্ষিক মিলনতীর্থ। কেউ আসছেন দেবীবন্দনার টানে, কেউ সংস্কৃতির সুর খুঁজতে, কেউবা আবার পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে কয়েকটি আনন্দের মুহূর্ত কাটানোর লোভে।

হাজার মাইল দূরের যান্ত্রিক জীবনের মাঝেও ঢাকের কাঠি যখন বেজে ওঠে, ধুনুচির সৌরভ যখন বাতাসে ভাসে, তখন নেকার আর গঙ্গার দূরত্বের ব্যবধানটুকু এক লহমায় মিলিয়ে যায়। ‘দোসর’ প্রমাণ করে দিয়েছে- পুজো মানে কেবল ধর্মাচরণ নয়। পূজো হলো প্রবাসের মাটিতে নিজের সংস্কৃতি, ভাষা আর শিকড়কে পরম আদরে এক সুতোয় বেঁধে রাখার চিরন্তন উৎসব।

ADVERTISEMENT